পাহাড়ি নগরে টিয়ানাময় সন্ধ্যা
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার সময় খাগড়াছড়ির বন বিভাগের সদর রেঞ্জ কার্যালয়ের প্রাঙ্গণ যেন অন্য এক রঙ ধারণ করে। গাছপালা ঘেরা মাঠ, ডালপালা ভর্তি কলতান—সবুজের মাঝে দেখা মেলে রক্তলাল বুক ও হলুদ ডানার টিয়া পাখিদের দলবেঁধে উড়ন্ত এক পরিবেশের। স্থানীয়রা ও প্রতিদিনের পর্যটকেরা আভিভূত হন পাখিদের কিচিরমিচির কোলাহলে।
স্থানটি গত এক দশক ধরে এসব পাখির নিরাপদ আবাসে পরিণত হয়েছে। বন বিভাগের কর্মীদের সতর্কতা ও নিয়মিত পাহারার কারণে শিকারের অনুপ্রবেশ কমে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে—ফলশ্রুতিতে টিয়াগুলো এখানে রাত যাপন করে এবং ভোরে খাবারের জন্য উড়েপড়ে যায়।
বনকর্মীদের পাশবী সতর্কতা ও পর্যটকের আগমন
খাগড়াছড়ি সদর রেঞ্জ কার্যালয়ের একজন বনকর্মী বলেন,
“প্রতিদিন রেঞ্জ ক্যাম্পাসে সন্ধ্যায় প্রচুর টিয়া পাখি আসে। এখানে রাতে টিয়া পাখিগুলো অবস্থান করে, সারা রাত থাকে এবং ভোরে ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে পাখিগুলো চলে যায়। এখানে প্রতিদিন অনেক পর্যটক আসেন, এসে পাখিগুলোর অবস্থান দেখেন।”আরেক বনকর্মী যোগ করেছেন,
“আমরা কঠোরভাবে নজরদারি চালাই, যাতে কেউ পাখিগুলোকে ডিস্টার্ব করতে না পারে বা গুলতি মারতে না পারে। কারণ, পাখিগুলো এই অঞ্চলে অনেক পাহাড় ও বনজঙ্গল থাকা সত্ত্বেও আমাদের অফিস প্রাঙ্গণে এসে থাকে।”
বনকর্মীদের উদ্যোগে স্থানটি এখন শুধুই স্থানীয় নাগরিকদের জন্যই নয়, দূর-দূরান্ত থেকে আগত পরিবার ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্যও আকর্ষণীয় পর্যটনস্থল হিসেবে পরিচিতির পথে। সন্ধ্যার সময় পাখিদের ঘন উপচে পড়া ও কলকাকলিতে পুরো কার্যালয় প্রাঙ্গণ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও স্থানীয় উদ্যোগ
খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য এলাকায় কয়েকবছর ধরে কাজ করছে বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন সোসাইটি অব সিএইচটি নামক একটি স্থানীয় সংগঠন। সংগঠকের বক্তব্য অনুযায়ী, পাখির উপস্থিতি ও নিরাপদ আবাস প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্থানীয় শিকারি‑প্রবণতা কম হওয়ায় টিয়াগুলো মানুষের সান্নিধ্যে নিরাপদভাবে বসবাস করছে।
সংরক্ষণের পাশাপাশি পাখিদের খাদ্য ও দীর্ঘমেয়াদী আবাস রক্ষায় স্থানীয়দের একটি পরিকল্পনাও দরকার। সংগঠনের বক্তব্য থেকে জানা যায়, বিভিন্ন ফলদ ও স্থানীয় গাছপালা রোপণের মাধ্যমে টিয়াদের খাদ্যসংস্থান নিশ্চিত করা যেতে পারে।
- স্থানীয় বনকর্মীদের নিয়মিত পাহারা টিয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
- শিকারি‑প্রবেশ না থাকায় গত এক দশক ধরে স্থানটি স্থায়ী আবাসে পরিণত হয়েছে।
- স্থানটি এখন স্থানীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে, যা স্থানীয় জীবিকাও প্রভাবিত করতে পারে।
ভবিষ্যৎ ও সংরক্ষণ কৌশল
টিয়াদের দীর্ঘসময় ধরে এখানে থাকার ঐতিহ্য বজায় রাখতে হলে শুধু নজরদারিই যথেষ্ট নয়—অপরিহার্য পরিকল্পনা হলো খাদ্য ও ছায়ার জন্য উপযুক্ত গাছ লাগানো ও এলাকার পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা। স্থানীয় উদ্যোগ এবং বনবিভাগের সমন্বয়ে এমন বেশ কিছু গাছ লাগানোর পরামর্শ সেখানে উঠে এসেছে।
| গাছের নাম | উদ্দেশ্য |
|---|---|
| বট | ছায়া ও শিকড়ের আশ্রয় |
| জাম, ডুমুর | ফল হিসেবে পাখিদের খাদ্যসংস্থান |
| পাকুড়, উদাল | স্থানীয় ফলদ ও বাস্তুতন্ত্র ভারসাম্যতা |
স্থানীয়রা বলছেন, যদি এই ধরনের উদ্যোগ বহুদূর এগিয়ে নেয়া যায়—উদ্বীর্ণ বৃক্ষরোপণ, টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা বৃদ্ধি—তবে খাগড়াছড়ির এই ছোট্ট প্রান্তর ভবিষ্যতে অনেক বেশি পরিবেশগত ও আর্থসামাজিক লাভ এনে দিতে পারে।
খাগড়াছড়ি বন বিভাগের রেঞ্জ ক্যাম্পাসে সন্ধ্যার সেই মধুর কলকাকলিই আপাতত সতর্কবার্তা বহন করছে—যদি এই পরিবেশটিকে রক্ষা করা যায়, তবে আগামীর পাহাড়ি জীববৈচিত্র্য ধরে রাখা সম্ভব; অন্যথায় ক্ষুদ্র জীবনরা আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।