সেনাবাহিনীর উদ্যোগে দুর্গম এলাকার স্বাস্থ্যসেবা
খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়নের বড়পাড়ায় মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুর থেকে লেলাং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ক্যাম্প পরিচালনা করা হয়। দুর্গম ও পাহাড়ঘেরা এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত চিকিৎসাসুবিধা ও যোগাযোগজনিত সমস্যার কারণে মানুষের ভোগান্তি ছিল—এই প্রেক্ষাপটে ক্যাম্পটি স্থানীয়দের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সেবার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোন ধরনের সেবা দেওয়া হলো
চিকিৎসা ক্যাম্পে সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় সাধারণ চিকিৎসাসেবা ছাড়াও বিশেষভাবে চক্ষু ও চর্মরোগ সংক্রান্ত পরামর্শ ও চিকিৎসা সেবা প্রদানের ব্যবস্থা ছিল। লেলাং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে বসানো ক্যাম্পে স্থানীয়রা চক্ষু ও চর্মরোগ বিষয়ে পরীক্ষা, উপদেশ ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পেয়েছেন। ক্যাম্প পরিচালিত ছিল দুপুর থেকেই।
- অনামিকা সেবা: সাধারণ সমস্যা যেমন জ্বর, কাশি-সর্দি, সংক্রমণ ইত্যাদি পরীক্ষা ও চিকিৎসা
- চক্ষু সেবা: চশকাসহ চক্ষু পরীক্ষা ও পরামর্শ
- চর্মরোগ সেবা: স্কিন সম্পর্কিত সমস্যা নির্ণয় ও চিকিৎসা পরামর্শ
স্থানীয় সহাবস্থান ও সম্প্রদায় বিশেষ গুরুত্ব
ক্যাম্পে বড়পাড়াসহ আশপাশের এলাকায় বসবাসরত চাকমা, মারমা ও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যনীয়। এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যসেবায় দুর্বিপাক ও পথচলা-অসুবিধা থাকার কথা স্থানীয়রা তুলে ধরেন; ফলে এমন রোগশিবির এগুলোকে সরাসরি সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখে। স্থানীয়দের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে দীর্ঘ বিরতির পর এই ধরনের উদ্যোগ নেওয়ায় তাদের মধ্যে স্বস্তি ও সন্তোষ দেখা দিয়েছে।
কর্মসূচি ও নেতৃত্ব
অধিকারে থাকা কর্মকর্তারা ও মেডিক্যাল টিমের উপস্থিতি ক্যাম্পের কার্যকারিতা বাড়িয়েছে। উপস্থিত ছিলেন লক্ষ্মীছড়ি জোনের জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল খান সজিবুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত উপ-অধিনায়ক মেজর নাহিয়ান ইমতিয়াজ, বর্মাছড়ি ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার ক্যাপ্টেন রিফাত ইবনে আলম ও মেডিকেল অফিসার ক্যাপ্টেন শাকিল। চক্ষু ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন কেয়াচিং মারমা ও ত্রিলোক চাকমা। বর্মাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুইসালা চৌধুরীও অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
| পদবী | নাম |
|---|---|
| জোন কমান্ডার | লেফটেন্যান্ট কর্নেল খান সজিবুল ইসলাম |
| ভারপ্রাপ্ত উপ-অধিনায়ক | মেজর নাহিয়ান ইমতিয়াজ |
| ক্যাম্প কমান্ডার | ক্যাপ্টেন রিফাত ইবনে আলম |
| মেডিকেল অফিসার | ক্যাপ্টেন শাকিল |
| চক্ষু বিশেষজ্ঞ | কেয়াচিং মারমা |
| চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ | ত্রিলোক চাকমা |
“দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। স্থানীয় বাসিন্দারা যাতে সহজে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেতে পারেন, সে জন্য সেনাবাহিনীর এ উদ্যোগ। ভবিষ্যতেও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের পাশে থাকা এবং পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থা জোরদারে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”
পটভূমি ও প্রাসঙ্গিকতা
খাগড়াছড়ি জেলার পাহাড়ি অঞ্চলে যোগাযোগ ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। সেই কারণেই মোবাইল মেডিক্যাল ক্যাম্প বা বিশেষ আয়োজন স্থানীয় মানুষের জন্য বড় কার্যকর ভূমিকা রাখে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র না পেলে বা যাওয়ার পথে সমস্যা থাকলে দূরন্ত অঞ্চলের বাসিন্দারা চিকিৎসার জন্য শহরে যেতে পারেন না—এই শারীরিক ও আর্থিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এমন উদ্যোগ জরুরি।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
স্থানীয়রা জানান, ক্যাম্পের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা পাওয়ায় দুর্ভোগ অনেকটাই কমে এসেছে। তারা চান এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিতভাবে চালানো হোক এবং দীর্ঘমেয়াদি বিশেষত চোখ ও মলম/চর্মরোগ চিকিৎসার জন্য স্পেশাল সুবিধা, রোগী-রেফারাল ও ফলো-আপ ব্যবস্থাও তৈরি করা হোক। প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও এ ধরনের কর্মসূচির সমর্থন ও সহযোগিতা বাড়ালে কার্যকারিতা বাড়বে বলে তারা আশা করেন।
লক্ষ্মীছড়ি জোনের এই কর্মসূচি পাহাড়ি অঞ্চলে সাময়িক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় বিশ্বাস এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি জোরদারে ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা রাখে—এটাই এই ধরনের উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি গণস্বাস্থ্যগত ও সামাজিক তাৎপর্য।
জাকির মিয়া, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি