কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার ছায়কোট এলাকার বাসিন্দা মো. সাগর (২৪) রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চার থেকে পাঁচ মাস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর শনিবার (১৭ অক্টোবর) এক সহযোদ্ধার ফোনে তার মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।
পরিবার ও প্রস্থান: স্বপ্ন আর ঋণের মোড়
সাগর ছিলেন তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। পরিবারের আর্থিক ঝোঁক দূর করতে তিনি একসময় আব্বার সবজি ব্যবসা ও রিকশাভ্যান চালাতেন। দেশে পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় তিনি গত বছর মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ৬ লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। প্রাথমিক সময় তিনি সেখানে একটি বেকারিতে কাজ করতেন এবং মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা আয় করতেন—পরে অধিক আয়ের আশায় এক বাংলাদেশি দালালের প্রলোভনে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।
যোগযোগ বন্ধ ও দুঃসংবাদের পরিণতি
চলতি বছরের মে মাসে সাগর যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। দীর্ঘ চার থেকে পাঁচ মাস কোনো খোঁজ না পেয়ে স্বজনেরা উদ্বিগ্ন ছিলেন। অবশেষে শনিবার একজন সহযোদ্ধার ফোনে পরিবারের কাছে তার মৃত্যুর খবর পৌঁছে। কী পরিস্থিতিতে কোথায় মৃত্যুবরণ করেছেন, এবং লাশ কোথায় রয়েছে—এসব বিষয়ে পরিবার এখনও নিশ্চিত তথ্য পায়নি। লাশ ফেরানো বা দাফনের প্রক্রিয়া কেমন হবে সেটাও জানা নেই।
পিতামাতার দুরবস্থা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
ছেলের মৃত্যুসংবাদে অসুস্থ পিতা কবির হোসেন ও মা দেলোয়ারা বেগম ভেঙে পড়েছেন। তারা ধার করে ছেলে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন; ধারণা ছিল সাগরের উপার্জন পরিবারের সংকট দূর করবে। এখন সেই আশা ভেঙে গেলে পরিবার মানসিক ও আর্থিক দুটো দসংঘাতে পড়েছে।
- নিহত: মো. সাগর, বয়স ২৪
- ঠিকানা: ছায়কোট, চান্দিনা, কুমিল্লা জেলা
- বিদেশে যাওয়া সময়: ২০২৫ সালের মাঝামাঝি
- বিদেশে কাজে আয়: মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা (বেকারি)
- রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য খরচ: প্রায় ৬ লাখ টাকা
- মৃত্যুর খবর জানা: ১৭ অক্টোবর, সহযোদ্ধার ফোনে (৪–৫ মাস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল)
লোককথ্য ও অর্থনৈতিক ব্যখ্যা
গ্রামীণ সমাজে বিদেশে গিয়ে দ্রুত সমৃদ্ধি অর্জনের গল্প নতুন নয়—এক ধরনের আধুনিক লোককথা হিসেবে দেখা যায়: ‘‘একজন বা দুজন সাফল্যের গল্প গ্রামের অনেকেরই আশা বাড়িয়ে দেয়।’’ কিন্তু এই আশার দরজা কখনোই ঝুঁকি-মুক্ত নয়। সাগরের ঘটনাও দেখায় কেবল মাইনে নয়, মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের প্রলোভন ও বিদেশের অস্থির পরিস্থিতি পরিবারের কাছে কী পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ছোট-চাকরির থেকে কিছুটা বেশি উপার্জন থাকলে পরিবারের কিছুটুকু সুরাহা যদিও সম্ভব, তবু তথ্যভিত্তিক প্রস্থান, বৈধ চ্যানেল ও নিরাপদ কর্মসংস্থান জরুরি।
ফরেনসিক ও প্রশাসনিক জটিলতা
বিদেশে নিহত হলে লাশ ফেরত যোগাযোগ, কাগজপত্র ও কনসলারের সহায়তা নির্ভর করে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার উপর। পরিবারগুলো প্রায়ই জানেন না ঠিক কীভাবে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত—কনসুলেটের সাথে যোগাযোগ, নিহতের পরিচয়পত্র, অভিবাসন সম্পর্কিত নথি ইত্যাদি জরুরি। সাগরের পরিবারের হাতে এখন এসব বিষয়ে কোনও তথ্য নেই, ফলে তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
| বিষয় | অবস্থা |
|---|---|
| নিহত | মো. সাগর, ২৪ |
| দেশ | রাশিয়া (নিহতের মৃত্যু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে) |
| লাশ ফেরত | পরিবারের কাছে নিশ্চিত তথ্য নেই |
| পরিবারগত পটভূমি | দারিদ্র্যকে পরাস্ত করার লক্ষ্য; ধার করে বিদেশ পাঠানো |
স্থানীয় সহায়তার আহ্বান ও পরামর্শ
স্থানীয় সমাজ ও সরকারি সংস্থাগুলোকে এই ধরনের পরিবারগুলোর জন্য মানসিক সেবা, কনসুলার যোগাযোগে সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্ৰহে সহায়তা করার আহ্বান জানান স্থানীয়রা। এছাড়া বিদেশে কাজের আগ্রহীদেরকে বৈধ চ্যানেল, স্বীকৃত নিয়োগকারী সংস্থা ও কনসুলেটের তথ্য যাচাই করতে বলা জরুরি।
এই ঘটনার মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কুমিল্লার গ্রামীণ সমাজে দির্ঘস্থায়ী: একদিকে স্বপ্নসাধনের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে ঝুঁকি-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও দালালবৃত্তির পরিণতি। এখন পরিবারের একটাই আশা—সাগরের লাশ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা যায় এবং তাদের কাছে কম হলেও মৃত্যুর সঠিক বিবরণ পৌঁছে।
মঈনুল বরকত, কুমিল্লা প্রতিনিধি