কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার ছায়কোট এলাকার মেহনতি পরিবারে এক অনিবার্য শোক নেমে এসেছে। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকার মো. কবির হোসেনের নাতি, তরুণ মো. সাগর (বয়স ২৪) রাশিয়া-ইউক্রেনে চলমান সশস্ত্র সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন।
পরিবারের বর্ণনা ও যাত্রাপথ
পরিবারের সঙ্গে ট্টো-যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর শনিবার এক বন্ধু রয়েছেন রাশিয়ায় থেকে পরিবারের কাছে সাগরের মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছে যায়। সাগর ছিলেন পরিবারের ছোট ছেলেমেয়াদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ—তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। দরিদ্র পক্ষে পরিবারের আর্থিক সহায়তার জন্য কিশোর বয়স থেকেই তিনি উপজেলা সদরের একটি রড-সিমেন্টের দোকানে রিকশাভ্যান চালাতেন।
পরিবার ও স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি তিনি কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে রাশিয়ায় যান। সেখানে প্রথমে একটি বেকারিতে কাজ শুরু করেন এবং মাসে আনুমানিক ৭০ হাজার টাকা উপার্জন করতেন। পরে পরিচয় হয় এক বাংলাদেশি মধ্যস্থকারীর সঙ্গে। পরিবার অভিযোগ করে, ওই ব্যক্তিটি সাগরকে রুশ সেনায় নিয়োগ পেতে সাহায্য করার কথা বলে এবং এককালীন ৩০ লাখ টাকা পাওয়ার প্রলোভন দেখায়।
পরিবারের দাবি ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া
সাগরের চাচা আবদুল আওয়াল বলেন, সাগর বেকারির কাজ ছেড়ে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার কথা তাঁাকে জানিয়েছিলেন। চাচা নিষেধ করেছিলেন; তবুও সে চলে যায়। পরিবারের অভিযোগ, দালাল ভুল তথ্য দিয়েই সাগরকে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণ করেছেন।
“বেকারির কাজ ছেড়ে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কথা সাগর আমাকে জানিয়েছিল। আমি তাকে বারণ করেছিলাম,”
সাগরের বাবা কবির হোসেন জানান, তিনি সবজির ব্যবসা করতেন এবং দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ; অনেক ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। প্রায় চার-পাঁচ মাস ধরে ছেলের সঙ্গে কথা হয়নি; সদ্য খবর পেয়েছেন যে তাঁর ছেলে আর নেই।
প্রশাসন ও আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান
চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আশরাফুল হক জানান, তাঁদের এখন পর্যন্ত এই ঘটনার সচেতনতা নেই এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
“বিষয়টি তাঁদের জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখব,”
স্থানীয় প্রশাসন ও কনস্যুলার সহায়তার প্রয়োজনীয়তা উত্থিত হওয়ায় পরিবারকে যথাযথ দিকনির্দেশনা ও সহায়তা দেয়া জরুরি মনে হচ্ছে।
অর্থনৈতিক চাপ, ভ্রমণ ও ঝুঁকি: স্থানীয় প্রেক্ষাপট
চান্দিনা অঞ্চলে বেকারত্ব এবং সীমিত আয় যেখানে বহু বাড়িকে অতিরিক্ত ঋণে ঠেলে দিয়েছে, সেখানে প্রলোভনমূলক চাকরির ঘোষণা দরিদ্র পরিবারগুলোকে সহজেই প্রলোভিত করে। এই কাহিনি শুধু একটি ব্যক্তি নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক সমস্যা—কিভাবে আর্থিক অবস্থা তরুণদের ঝুঁকিতে ফেলে।
- আর্থিক পটভূমি: পরিবার অনেক ধারদেনা করে প্রবাস পাঠানোর প্রয়াসে—এটি সাধারণ প্রেক্ষাপট।
- মধ্যস্বন্যানের ভূমিকা: বিদেশে চাকরি দেওয়ার নামে অনেকে মাঝে মধ্যস্থতা করে; তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই জরুরি।
- রক্ষণশীল তথ্যপ্রাপ্তি: বিদেশে থাকায় পরিবারের সংখ্যা-ভিত্তিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে বাস্তব পরিস্থিতি জানা কঠিন হয়ে পড়ে।
ঘটনাটির সময়রেখা
| ঘটনা | সময় |
|---|---|
| রাশিয়ায় যাত্রা (প্রারম্ভিক কাজ বেকারিতে) | ২০২৫ সালের মধ্যে |
| রাশিয়ায় মাসিক উপার্জন | ৭০ হাজার টাকা আনুমানিক |
| সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য প্রলোভন | চলতি বছরের মে |
| পরিবারকে মৃত্যুর সংবাদ | শনিবার, ১৭ অক্টোবর |
স্থানীয় প্রশাসন যদি দ্রুত ঘটনার খোঁজ-খবর ও তদন্ত করেন, তবে কান্তরপ্রাপ্ত পরিবারকে ন্যায্য সহায়তা এবং ভবিষ্যতে এমন অনৈতিক নিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। সমসাময়িক প্রেক্ষিতে চাই পররাষ্ট্র দফতর এবং কনস্যুলেট পর্যায়ে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দালাল-পাঠানীদের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি।
এই কাহিনি কেবল একজন তরুণের ব্যর্থ স্বপ্ন নয়—এটি আমাদের এলাকায় বিদ্যমান কর্মসংস্থান সংকট ও অসংগঠিত মধ্যস্থতার প্রতিবিম্ব। প্রবাসের আশায় প্রাণ হারানো পরিবারগুলোর কষ্ট সরকারের কাছেও নজিরবিহীন বার্তা পৌঁছানো উচিত।
মঈনুল বরকত, কুমিল্লা প্রতিনিধি, ZTL