জয়পুরহাট: চলতি মৌসুমে জয়পুরহাটের কলা চাষিরা বিপুল আর্থিক সংকটে পড়েছেন। নানা রোগবালাই ও অনুকূল নয় এমন আবহাওয়ার কারণে জমিতে কলা অনুপক্ব অবস্থায় পেকে যাচ্ছে, গাছের পাতা মড়ার পাশাপাশি ফলের ওপর কালো দাগ দেখা দিয়েছে। একপর্যায়ে কোথাও কোথাও গাছ ভেঙে পড়ায় ক্ষতি আরও বড় হচ্ছে। একই সঙ্গে বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি কমে যাওয়ায় উৎপাদিত কলার ন্যুনতম মূল্যও মিলছে না বলে অভিযোগ করেছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
ক্ষতির প্রকৃতি ও চাষিদের কণ্ঠ
জয়পুরহাট সদর উপজেলার আউশগাড়া মহল্লার তুলনায় হালেই অবসর প্রাপ্ত পুলিশ সদস্য গোলাম ফারুক বলেন, তিনি দেড় বিঘা জমিতে সাগর কলার চাষ করেছিলেন। কিন্তু এবার ফল পরিপক্ব হওয়ার আগেই পাকতে শুরু করেছে এবং গাছের পাতা মরে যাওয়ায় ব্যাপক লোকসান হচ্ছে।
"এবার দেড় বিঘা জমিতে সাগর কলা চাষ করেছি, কিন্তু ফল পরিপক্ব হওয়ার আগেই পেকে যাচ্ছে। গাছের পাতা মরে যাচ্ছে, লোকসান ভয়ানক।"
আউশগাড়া এলাকার আরও কয়েকজন কৃষক—সাজ্জাদ হোসেন ও আব্দুল হামিদ—ধারদেনা করে কয়েক বিঘা জমিতে চিনি চম্পা জাতের কলা চাষ করেছিলেন। তাদের বাগানে ফলন সন্তোষজনক হলেও কলায় কালো দাগ দেখা যাচ্ছে এবং কোনো কোনো স্থানে গাছ ভেঙে পড়ায় ক্ষতি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমান পরিস্থিতিতে উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না, ব্যবসায়িক মুনাফা কল্পনাই ব্যর্থ হয়েছে।
বাজার সংকট: দুর্গাদহ হাটে বিক্রির অবস্থা
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় কলার হাট হিসেবে পরিচিত দুর্গাদহ বাজারে এ মৌসুমে ক্রেতার উপস্থিতি কমে গেছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক ও পাইকাররা এখানে কলা নিয়ে এসেও প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছেন না বলে জানান হাটে গিয়ে দেখা কৃষকরা। ভাদসা ইউনিয়নের এই হাটে এক কৃষকের কথায়, তিনি সাইকেলে করে দুই ঘাউড় কলা নিয়ে গিয়েছিলেন; কিন্তু ক্রেতা না হওয়ায় দুই ঘাউড় কলার দাম হয়েছে মাত্র ৬০০ টাকা, যা উৎপাদন খরচও বহন করতে পারছে না।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য
কৃষকরা অভিযোগ করলেও স্থানীয় কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, মাঠপর্যায়িয়ে নিরাপদ কলা উৎপাদন, রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ রোধে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সময়ে উপজেলা প্রশাসন বলেছে, বাজার সম্প্রসারণ ও যানজট নিরসনে উদ্যোগ নেয়া হবে যাতে বেচাকেনায় সুবিধা হয়। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি ক্ষতিপূরণ, দ্রুত মাঠপর্যায়ের সঠিক প্রযুক্তিগত পরামর্শ এবং বাজার ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য বাস্তব উদ্যোগ নেয়া।
স্থানীয় প্রভাব ও সম্ভাব্য পরবর্তী প্রভাব
কৃষকরা যে ধরনের সমস্যা বর্ণনা করেছেন, তা দীর্ঘ মেয়াদে যদি চলতে থাকে তবে নিম্নলিখিত প্রভাব দেখা দিতে পারে:
- ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ঋণব্যবস্থার চাপ বৃদ্ধি ও জীবনমান খারাপ হওয়া।
- স্থানীয় পদ্ধতিতে বেচাকেনা কমে গেলে মধ্যস্থতাকারী ও পাইকারদের চাহিদার অনিশ্চয়তা।
- ফসলের মান ও বাজারযোগ্যতার পতনে উপজেলার কৃষি পণ্যের সম্মুখ্যিত প্রতিযোগিতা দুর্বল হওয়া।
দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণে চাহিদা
কৃষকরা ক্ষতিপূরণ, জরুরি প্রযুক্তিগত সহায়তা, এবং বাজার বর্ধন ও যানজট রোধে কার্যকর উদ্যোগ দাবি করেছেন। বিশেষত:
- ক্ষতিগ্রস্ত ফসল যাচাই করে আর্থিক সহায়তা প্রদান।
- রোগবালাই শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ের তত্ত্বাবধানে দ্রুত প্রশিক্ষণ ও কীটনাশক ব্যবহার সম্পর্কে নির্দেশনা।
- বাজার সম্প্রসারণ, সরাসরি বিক্রির সুযোগ এবং পরিবহণ সুবিধা নিশ্চিতকরণ।
| দিক | অবস্থা |
|---|---|
| ফসলের অবস্থা | অনুপক্বে পাক, কালো দাগ, পাতার মরন, কিছু স্থানে গাছ ভেঙে পড়া |
| বাজার মূল্য | দুই ঘাউড় কলা বিক্রি হয়ে ≈ ৬০০ টাকা (কিছু বিক্রেতার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী) |
| কৃষকের দাবি | ক্ষতিপূরণ, দ্রুত মাঠ পরামর্শ, বাজার ব্যবস্থা উন্নয়ন |
উপসংহার
জয়পুরহাটের কলা চাষিরা এখন দ্রুত সহায়তা না পেলে মৌসুমে সৃষ্ট লোকসান তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে দেবে। কৃষি বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন যদি মাঠপর্যায় কার্যকর এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেয়—যেমন: রোগ নির্ণয়, সঠিক কীটনাশক ব্যবহার, বাজার ব্যবস্থার সংস্কার ও ক্ষতিপূরণ—তবে ক্ষতির মারাত্মক প্রভাব অনেকটা কমানো সম্ভব। কৃষকরা সে অনুযায়ী বাস্তব সমাধান দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।
রিপোর্টার: মুনিরা আলী, জয়পুরহাট থেকে