গাজীপুরের কোনাবাড়ীর জরুন শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত কেয়া গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠানে দ্বিতীয় দফায় ৭৩৯ জন শ্রমিক ও কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। কারখানার মুখে সোমবার রাত সাড়ে দশটার দিকে সংশ্লিষ্ট নোটিশ টাঙানো হয় এবং কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে ব্যাংকিং জটিলতা ও গ্যাস বিল পরিশোধে ব্যর্থতা উল্লেখ করেছে।
ছাঁটাইয়ের পটভূমি ও নোটিশের বিষয়বস্তু
কেয়া গ্রুপের নিট কম্পোজিট ডিভিশন, স্পিনিং ডিভিশন, কটন ডিভিশন ও কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেড—এই চারটি ইউনিট থেকেই ২০ অক্টোবর থেকে শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২০ ধারা অনুযায়ী অতিরিক্ত কর্মী-শ্রমিকদের ছাঁটাই করার কথা বলা হয়েছে। নোটিশে বলা হয়, ব্যাংকিং জটিলতা ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে উৎপাদন সুষ্ঠুভাবে চালাতে না পারায় এবং কাজের প্রয়োজনের তুলনায় শ্রমিকসংখ্যা বেশি থাকায় প্রশাসনিক ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
লে-অফ থেকে ছাঁটাই: কী হয়েছে আগের কয়েক মাসে
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ৬ জুন থেকে কারখানাগুলো লে-অফে ছিলো এবং এর পর কয়েক দফা লে-অফ বাড়ানো হয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে লে-অফের কয়েক দফা শেষে নির্দিষ্ট সংখ্যক পদ বিলুপ্ত করে ছাঁটাই করা হবে। প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, বিধি অনুযায়ী ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের আইনানুগ পাওনা পরিশোধ করা হবে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে শ্রম আইন, ধারা ২১ অনুযায়ী দক্ষ ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
- ইউনিটসমূহ: নিট কম্পোজিট, স্পিনিং, কটন, ইয়ার্ন মিলস
- ছাঁটাই সংখ্যা: ৭৩৯ জন
- লে-অফ শুরু: ৬ জুন থেকে
- প্রধান কারণ: ব্যাংক সম্পর্কিত জটিলতা ও গ্যাস বিল পরিশোধে ব্যর্থতা
শ্রমিকদের প্রতিক্রিয়া ও স্থানীয় পরিস্থিতি
মঙ্গলবার সকাল থেকেই ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকেরা কারখানার সামনে ভিড় করেন এবং তাদের নামের তালিকা দেখতে যান। অনেকেই নীরব কষ্ট ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। সুইং সেকশনের অপারেটর ইয়াসমিন বেগম জানান, “দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে এই কারখানায় কাজ করছি। এখন চাকরি হারিয়ে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব—সেটাই চিন্তার বিষয়।” পরিচ্ছন্নতাকর্মী আবেদা বেগম, যিনি প্রায় ১৯ বছর এখানে কাজ করেছেন, বলেন, “এত বছর চাকরি করে শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতে বিদায় নিতে হচ্ছে।”
“পাঁচবার লে-অফের পর এক নোটিশে ৭৩৯ জনকে ছাঁটাই করা নিন্দনীয়; বকেয়া ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দ্রুত দিতে হবে,”—জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান।
স্থানীয় শিল্পাঞ্চল পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কারখানাগুলোর প্রধান ফটকে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| ছাঁটাই সংখ্যা | ৭৩৯ জন |
| ছাঁটাই কার্যকর | ২০ অক্টোবর থেকে |
| লে-অফ শুরু | ৬ জুন |
| মূল কারণ | ব্যাংকিং জটিলতা, গ্যাস বিল পরিশোধে ব্যর্থতা |
স্থানীয় প্রভাব ও পরবর্তী সম্ভাবনা
কেয়া গ্রুপের এই সিদ্ধান্ত গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের শ্রম বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। বড় পরিমাণে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক একযোগে চাকরি হারালে তাদের পরিবারগুলোর আয়ের ওপর কেন্দ্রীয় ক্ষতি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে চাহিদা হ্রাস পেতে পারে। কর্মক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া মেনে ক্ষতিপূরণ ও বকেয়া পরিশোধ করা হবে বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করলেও বাস্তবে কত দ্রুত ও পূর্ণভাবে তা দেওয়া হবে, তা শ্রমিকদের মধ্যে সন্দেহের জায়গা রেখে দিয়েছে।
অবকাঠামো ও তেলগ্যাসের সমস্যার পাশাপাশি ব্যাংকিং জটিলতা সমাধান না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশংকা আছে। স্থানীয় প্রশাসন, শিল্পমালিক ও শ্রম সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি না হলে শ্রমবিবাদ এবং সামাজিক অস্থিরতা গভীর হতে পারে—এটি গাজীপুরের প্রশাসন ও শিল্পহিতৈষীদের জন্য একটি সময়োপযোগী সতর্ক সংকেত।
এই ঘটনার পরবর্তী কার্যক্রম ও শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের বাস্তবায়ন নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও শ্রম অধিদফতরের প্রতিক্রিয়া পেলে পাঠকদের জানানো হবে।