সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে সংঘটিত গণপিটুনিতে (মব জাস্টিস) হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী জবানবন্দি দিয়েছেন বলে আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
আদালতে স্বীকারোক্তি এবং পরবর্তী ব্যবস্থা
স্থানীয় জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম (তৃতীয় আদালত) নুসরত জাহান-এর খাস কক্ষে রবিবার সন্ধ্যায় আমিনীকে কক্ষপদ্ধতিতে হাজির করে জবানবন্দি নেওয়া হয়। আদালত সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই ঘণ্টা জবানবন্দি গ্রহণের পর রাত সাড়ে দশটার দিকে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
আটক হওয়ার প্রেক্ষাপট
পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা দেবহাটা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আল আমিন জানিয়েছেন, শনিবার রাতে কালীগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের ফরিদপুর গ্রামের বাসিন্দা বসির আহম্মেদ শেখের বাড়ি থেকে আমিনীকে গ্রেপ্তার করা হয়। রোববার রাত সাড়ে সাতটার দিকে তাঁকে আদালতে হাজির করা হয় এবং ওই সময় তিনি ওয়াহেদুজ্জামান হত্যা মামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
- নাম: ফজলুল হক আমিনী
- ঠিকানা: দেবহাটা উপজেলার দক্ষিণ পারুলিয়া গ্রাম (রুহুল আমিনের ছেলে)
- পেশা: মোটরসাইকেলচালক
জবানবন্দির প্রধান বক্তব্য
জবানবন্দিতে আমিনী দাবি করেছেন—"ওয়াহেদুজ্জামান শামীম নাস্তিক ছিলেন" এবং হত্যার উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না; ঘটনাটি ছিল 'এক্সিডেন্টলি'।
আদালতের এক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছেন, আমিনী হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যান্য ব্যক্তিদের নামও জবানবন্দিতে প্রকাশ করেছেন। তবে আদালত বা তদন্তকারী সংস্থা এখনও ওই নামগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি।
পরিবার ও স্থানীয় পরিবেশ
স্থানীয়দের বরাতে জানা যায়, ফজলুল হক আমিনী দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেলে যাত্রী বহন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কালীগঞ্জ উপজেলার ফরিদপুর গ্রামের বাসিন্দা বসির আহম্মেদ সংবাদ মাধ্যমে জানিয়েছেন যে আমিনী তাঁর চাচাতো ভাই। পরিবার সূত্রে জানা যায়, ঘটনার পর আমিনী প্রথমে নিজ বাড়িতে ফেরেন এবং পরে শনিবার রাত পুলিশ ও এসআরবি সদস্যদের মাধ্যমে গ্রেপ্তারের আগে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন। আত্মসমর্পণের ঘটনাটি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে পুলিশের নজরে আসে।
আপাতত কতটুকু নিশ্চিত
আদালতের পুলিশ পরিদর্শক নাজমুল হক জানান, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণের পর রোববার রাত ১০টার দিকে আমিনীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলাটির তদন্ত চলছে এবং আদালত-আটক-জবানবন্দি সম্পর্কিত আনুষঙ্গিক কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
| তারিখ/সময় | ঘটনা |
|---|---|
| ১৩ অক্টোবর (স্থানীয়) | দেবহাটায় ধর্মীয় অভিযোগ তুলে গণপিটুনিতে ওয়াহেদুজ্জামান সানা (শামীম) নিহত (প্রাথমিক খবর) |
| ১৭ অক্টোবর রাত (সূত্র অনুযায়ী) | কালীগঞ্জের ফরিদপুর গ্রামের বাসা থেকে আমিনী গ্রেপ্তার |
| রোববার (প্রকাশের পূর্বে) | আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান, রাত্রে কারাগারে পাঠানো |
স্থানীয়রা বলছেন, দেবহাটায় এধরনের ঘটনার ফলে এলাকায় উত্তেজনা বাড়েছে এবং সামাজিক সহাবস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পরিবারের লোকজন ও প্রতিবেশীরা নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার দাবি করছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এবং আদালত উভয় ক্ষেত্রেই তদন্ত ও প্রমাণ সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। আমিনী যে প্রকাশ্যে হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন, তা দেশের আইনগত প্রক্রিয়ায় কীভাবে দণ্ড ও বিচারের মুখে ধরা পড়ে, সেটিই এখন প্রাথমিক তদন্ত ও পরবর্তী আদালতের শুনানিতে স্থির হবে।
ঘটনাস্থল দেবহাটা উপজেলার সামাজিক-ধর্মীয় পরিবেশ ও সম্প্রদায়ের মধ্যকার সম্পর্ক কেমনভাবে প্রভাবিত হবে, তা নিয়েও স্থানীয় কর্মকর্তা ও সমাজ নেতা পর্যবেক্ষণ করছেন। নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সন্ত্রাসবোধ কমাতে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ তৎপর রয়েছে বলে জানা গেছে।