বরিশালের মুলাদী উপজেলায় গত ২১ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিল অষ্টম শ্রেণির এক কিশোরী। তার নিখোঁজের প্রায় ছয় মাস পর—গতকাল—নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকা থেকে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-১১ এবং স্থানীয় পুলিশি অভিযান মিলিয়ে কিশোরীকে উদ্ধার করে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুই আসামিকে—মুলাদীর বাটামারা ইউনিয়নের মো. আসলাম ভূঁইয়া (৩০) ও মো. সজিব (২০)।
পাঠ্যপথে দীর্ঘদিন উত্ত্যক্তের অভিযোগ
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, কিশোরীটি স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে আসলাম দীর্ঘদিন ধরে তাকে কুপ্রস্তাব করে উত্ত্যক্ত করতেন। পরিবার থেকে প্রতিবাদ করেও তিনি থামেননি। এ অভিযোগের ভিত্তিতে পরিবারের লোকজন জানান, ২১ এপ্রিল সন্ধ্যায় বাড়ির সামনে থেকে কিশোরীকে কাছে ডাকিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়—বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ও ফুসলিয়ে।
খোঁজাখুঁজি করে সে না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নেন। ২৪ এপ্রিল কিশোরীর বাবা মুলাদী থানা পুলিশে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর ২ মে মামলার জন্য থানায় গেলে তাদের কাছে অভিযোগ গ্রহণ না করে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলে পারিবারিক অভিযোগে উল্লেখ আছে।
আদালত নির্দেশে মামলা নথিভুক্তি
পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যরা বরিশালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। ২৯ জুন ট্রাইব্যারাল-এ বিচারক মামলাটি আমলে নিয়ে মুলাদী থানাকে নিয়মিত মামলা নথিভুক্ত করতে নির্দেশ দেন। এরপর ১ জুলাই মুলাদী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা নথিভুক্ত করা হয়। মামলায় পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ও উদ্ধার অভিযানের বিবরণ
মুলাদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার মো. সোহেল রানা জানান, "এসআরবির সহায়তায় অপহরণ মামলার দুই আসামিকে গ্রেপ্তার ও স্কুলছাত্রীকে উদ্ধার করা হয়েছে।" উদ্ধার হওয়া কিশোরীর বক্তব্য গ্রহণ, পরীক্ষা ও চিকিৎসাসংক্রান্ত কার্যক্রম আইন অনুযায়ী সম্পন্ন করা হবে বলে তিনি আরও জানান।
"এসআরবির সহায়তায় অপহরণ মামলার দুই আসামিকে গ্রেপ্তার ও স্কুলছাত্রীকে উদ্ধার করা হয়েছে।"
ওসি বলেন, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কিশোরীর ঠিকা বা অবস্থার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি এবং চিকিৎসা-প্রতিষ্ঠানে নেওয়ার বিষয়টি শুধুমাত্র আইনি ধরন অনুসরণ করে করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
- গ্রেপ্তারকৃতঃ মো. আসলাম ভূঁইয়া (৩০), মো. সজিব (২০)
- অভিযোগের ধরনঃ বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ, কুপ্রস্তাব ও উত্ত্যক্তকরণ
- মামলাঃ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী মামলা নথিভুক্ত
| তারিখ | ঘটনা |
|---|---|
| ২১ এপ্রিল | কিশোরী বাড়ির সামনে থেকে অপহরণ |
| ২৪ এপ্রিল | জিডি করা হয় |
| ২ মে | থানায় অভিযোগ করলে মামলা গ্রহণ না করে আদালতের পরামর্শ |
| ২৯ জুন | ট্রাইব্যুনাল মামলাটি আমলে নেয় |
| ১ জুলাই | মুলাদী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা নথিভুক্ত |
| গতকাল | এসআরবি ও পুলিশের যৌথ অভিযান — কিশোরী উদ্ধার ও ২ জন গ্রেপ্তার |
পরিবার ও স্থানীয়রা জানায়, অপহরণকারীরা কিশোরীর স্বজনদের বিভিন্ন সময় হুমকি দিত এবং মামলা করলে কিশোরীকে হত্যা করা হবে বলে ভয় দেখানো হতো। পরিবারের নেতা-কর্মীরা বলছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে থানার আচরণ সঠিকভাবে না হওয়ায় তারা ভয় পেয়েছিলেন এবং আইনি সংগ্রাম চালিয়ে ট্রাইব্যুনালে পৌঁছেছিলেন।
স্থানীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং প্রতিবেশীরা জানান, দীর্ঘ সময় ধরে কিশোরীটি স্কুলে নিয়মিত যাতায়াত করত এবং অভিযোগ ছিল যে পথের মানুষজন তাকে ফুসলানোর চেষ্টা করত, কিন্তু তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিষয়টি স্থানীয় সামাজিক নিরাপত্তা ও নারীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
এ ঘটনায় পুলিশের উপযুক্ত অনুসন্ধান, কিশোরীর মানসিক ও চিকিৎসাগত সহযোগিতা ও পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের ওপর স্থানীয়রা জোর দিয়েছেন। তারা বলেছেন, ভবিষ্যতে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্কুল-বাস ও ঘরের আশেপাশে মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
এই ঘটনায় মুলাদী থানার তদন্ত ও এসআরবি-১১--এর কার্যক্রম জেলা প্রশাসন এবং নারী ও শিশু অধিকার সংস্থাগুলোর নজরকেও কাড়বে বলে প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা। মামলা তদন্তের অগ্রগতি এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের পরবর্তী তথ্য অনুসরণ করা হবে।
রফি করুণ, বরিশাল প্রতিনিধি