ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ও রীতিনিষ্ঠতা
জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়িতে প্রতিবছর যেভাবে দূর্গা পূজা পালন করা হয়, তাতে রয়েছে পুরোনো কালের অনন্য আচার-অনুষ্ঠান। ১৫১০ সাল থেকে চলে আসা এই পূজা এ বছর ৫১৭তম বর্ষে পৌঁছেছে। রাজপরিবার ও শহরের বহু মানুষ এদিন রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে জড়ো হন, ঢাক-শাঁখের তালেই মা দুর্গাকে বিদায় জানানো হয়—আর সেই বিদায়ের আয়োজনে আছে বিশেষ ধরণের ভোজ ও গ্রহণকৃত নিষেধ।
বিসর্জন দেখেন না রাজপরিবার
বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায় রাজপরিবারের সদস্যরা প্রথা মেনে প্রতিমার বিসর্জন দেখতে যান না; বরং মাকে রথে তুলে রাজবাড়ির পুকুরের ধারে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের একজন, প্রণত বসু, প্রতিবেদনে জানান, “রাজ পরিবারের সদস্যরা বিসর্জন দেখতে পারেন না। কারণ আমাদের মা নিত্য পূজিতা।” ঐতিহ্য অনুযায়ী বিদায়ের সময় উপস্থিতরা মায়ের দিকে মুখ করে থাকে না। অতীতে বন্দুক ফাটানো হতো; বর্তমানে সেই রীতি বজায় রেখে বদলে পটকা ফাটানো হয়।
দশমীর ভোগ: পার্থক্য ও উপকরণ
বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দশমীর ভোগে সাধারণ বাঙালি সভ্যতার থেকে ভিন্ন মাত্রার খাদ্যদান দেখা যায়। দুপুরে দেবীর কাছে প্রদত্ত ভোগে থাকে পান্তা ভাত, ভাজা ইলিশ, কচুর শাক, পুঁটি মাছ এবং শাপলার তরকারি—মোটামুটি পাঁচ রকম মাছ-ভিত্তিক আমিষভোগ। এসব পদ কাঁসার থালায় সাজিয়ে নিবেদন করা হয় এবং এই ভোগই রাজবাড়ির বিদায়ের প্রধান অংশ।
| পদ | বিবরণ |
|---|---|
| পান্তা ভাত | দশমীর দুপুরে প্রধান ভোগ হিসাবে পরিবেশন |
| ইলিশ মাছ (ভাজা) | ভাজা ইলিশ রাজবাড়ির ভোগের অপরিহার্য উপাদান |
| কচুর শাক | বিশেষ স্বাদের সঙ্গে ভোগে রাখা হয় |
| পুঁটি মাছ | ঝোল বা ভাজা হিসেবে পরিবেশন করা হয় |
উপস্থিতি ও সামাজিক প্রভাব
রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে প্রতিবারই লোকসমাগম হয়—শহরের মানুষ থেকে আশপাশের গ্রাম-পাড়া পর্যন্ত সবাই এখানে জড়ো হন। সিঁদুর খেলা, নাচ ও ঢাক-শাঁখের তালে পরিপূর্ণ এই আয়োজনে বিচিত্র বয়সীদের দেখা যায়; গৃহিণী থেকে বৃদ্ধা—অনেকেই অংশ নেন। রীতির সময়ক্ষেত্রে একাধিক জনসংস্কৃতিক আচার-অনুষ্ঠান একসঙ্গে ঘটে এবং বিদায়ের মূহুর্তে অনেকে আবেগপ্রবন হন।
রীতির পরিবর্তন ও আধুনিকতার ছোঁয়া
রাজবাড়ির এই প্রাচীন পূজায় আধুনিকতার চাহিদা এলেও বেশিরভাগ প্রথাই অক্ষুন্ন রাখা হয়েছে। বিবর্তনের সঙ্গে কিছু পরিবর্তন এসেছে—যেমন বন্দুক ফাটানো বন্ধ করে পটকা ব্যবহার করা। তবে মাইক্রোফোন বা কৃত্রিম ধ্বনি-প্রযুক্তির ব্যবহার এখানে সীমিত: মা বিদায় জানানোর সময় ঢাকের তালিই প্রধান সঙ্গীত।
উপসংহার: সংরক্ষণ ও জনসম্পৃক্ততা
৫১৭ বছরের প্রাচীন এই পূজা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানই নয়, অঞ্চলটির সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। লোকজ-রীতির সংরক্ষণ, স্থানীয় অনুষ্ঠানপ্রণালী ও জনসমাগম—এসব মিলেই বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গাপূজোকে আলাদা করেছে। প্রতিবারের মতো এবারও হাজারো মানুষ একই ধারাবাহিকতায় অংশ নিয়েছে, এবং এই ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মেও চলমান রাখার আশা প্রকাশ করা হয়।
- বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির পূজা ১৫১০ সাল থেকে পালিত হচ্ছে (এবার ৫১৭তম)।
- রাজপরিবার বিসর্জন দেখেন না; বিদায়ের সময় মাকে চোখের দিকে না দেখে রথে নিয়ে যাওয়া হয়।
- দশমীর ভোগে প্রধানত পান্তা ভাত ও বিভিন্ন মাছ-ভিত্তিক পদ পরিবেশন করা হয়।
“রাজ পরিবারের সদস্যরা বিসর্জন দেখতে পারেন না। কারণ আমাদের মা নিত্য পূজিতা।” — প্রণত বসু
তথ্যসূত্র: ইটিভি ভারত (ETV Bharat) প্রতিবেদনের বর্ণনা অনুবর্তী করে সংকলিত।